গত কিছুদিন
ধরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক, উদ্যোক্তা ও বক্তা সাবিরুল ইসলামের
অর্জনের খবর পড়ে আরো একবার গর্বিত এবং অনুপ্রাণিত হলাম। সাধারণত আমাদের
বাবা-মা তাদের সন্তানদের এবং শিক্ষকরা তাদের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে বিখ্যাত বা
মহাপুরুষদের জীবনকাহিনী ও অর্জন শুনিয়ে অনুপ্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করে
থাকেন। কিন্তু খুব কম মানুষই তাতে অনুপ্রাণিত হয়। কারণ আমরা এটা ভেবেই বসে
থাকি যে তারা বিধাতা প্রদত্ত অসাধারণ মেধার অধিকারী হয়ে পৃথিবীতে এসেছেন
তাই তারা বিখ্যাত হয়েছেন। আমি অত মেধাবী নই অতএব আমার দ্বারা তেমন কিছু করা
সম্ভব নয়। কিন্তু যখন আমাদের আশপাশের সাধারণ মানুষটি অসাধারণ কিছু করে বসে
তখন তা আমদের অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করে। আমি নিজে যেমন বিভিন্ন মানুষের
অর্জন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছি আমার খুব কম সময়ের শিক্ষকতা জীবনে
ছাত্র-ছাত্রীদের সেই গল্পগুলো বলে তাদের অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করেছি।
যাদের অর্জনগুলো আমাকে এই অনুপ্রেরণা দিয়েছে সেই গল্পগুলো সাবিরুলের মতো
আরো হাজার হাজার অনুপ্রেরণার গল্প তৈরি করবে সেই স্বপ্ন নিয়েই সবার সাথে
শেয়ার করছি। প্রথম দুইটি গল্প যাদেরকে নিয়ে লেখা তাদেরকে আমি সরাসরি চিনি
না। তাদের খুব কাছের লোকদের থেকে আমি তাদের গল্প শুনেছি। তাই এই দুই জনের
ক্ষেত্রে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হল। আশা করি, সংবাদকর্মীরা এই দুজনের অনুমতি
নিয়ে তাদের এই গল্পসহ বাকি সবার সাফল্যের গল্প আরো অনেক বড় আঙ্গিকে দেশের
তরুণ পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেবেন।
![]() |
গল্প ১
মাসুদ করিম, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। কিশোর বয়সে পড়ালেখার চেয়ে
খেলাধূলায় মনোযোগ একটু বেশি ছিল। তাই চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি
পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান হয়নি। কিন্তু খেলাধূলায় পারদর্শী হওয়ার কারণে
খেলোয়াড় কোটায় ভর্তি হয়েছিলেন। একজন ছাত্র যখন খেলোয়াড় কোটায় ভর্তি হয় আর
যখন সে দেখে তার সহপাঠীরা কেউ মাধ্যমিক অথবা উচ্চমাধ্যমিকে স্ট্যান্ড বা
স্টার মার্ক্স পেয়ে মেধাতালিকা থেকে ভর্তি হয়েছে তখন তার ভিতরে সেই
আত্ববিশ্বাস থাকে না যে সে ক্লাস এ খুব ভাল ফলাফল করতে পারবে। যথারীতি সে
ধরেই নেয় যে ভাল ফলাফল তার জন্যে না। কিন্তু চেষ্টা এবং অনুপ্রেরণা থাকলে
অনেকেই সাফল্যের চরম শিখরে উঠতে পারে। আমাদের আফসোস যে অনুপ্রেরণা দেওয়ার
মানুষ আমাদের নেই তাই আমরা নিজেদের ভেতরের মেধা হয়ত সারাজীবনেও আবিস্কার
করতে পারি না। মাসুদ করিম যথারীতি চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোটামুটি
ফলাফল করেন। তারপর ইংল্যান্ড এর উদ্দেশে পাড়ি জমান মাস্টার্স করতে। সেখানে
থাকা অবস্থায় তিনি নিজের মেধা কে আবিস্কার করেন এবং একসময় সিঙ্গাপুর
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়ে যান। তার পর আর পিছু
ফিরতে হয়নি। পিএইচডি শেষ করে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাক কুয়ার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ করে এখন অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
আমি নিশ্চিত মাসুদ করিম কোনদিন নিজেও ভাবেননি যে তিনি এত মেধাবী। আমার
ধারণা কোনরকম একটা চাকরি করে জীবন পার করাই একসময় তার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু
মাসুদ করিম পেরেছেন তার মেধাকে খুঁজে বের করতে। আমরা যারা ক্লাসের মাঝারি
মানের ছাত্র তাদের জন্য মাসুদ করিম এক আদর্শ অনুপ্রেরনার প্রতীক।
গল্প ২
আশির দশকের কথা। তখনকার দিনে মেয়েদের পড়াশোনার হার ছিল অনেক কম। তারপরও
যারা ভালো ফলাফল করতে পারত না তাদেরকে সাধারণত বাবা-মা বিয়ে দিয়ে তাদের
দায়িত্ব পালন করতেন। নাম তার সাবিহা সুলতানা। এসএসসি এবং এইচএসসিতে দ্বিতীয়
বিভাগ পেয়েছিলেন। তারপর বরিশালের একটি কলেজে গণিত বিভাগে স্নাতকে ভর্তি
হয়েছিলেন। এরমধ্যে বাবা-মা ভাল পাত্র দেখে বিয়েও দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু
পড়াশোনার প্রতি অদম্য ইচ্ছা থেকেই পরিবারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি
পড়ালেখা চালিয়ে গেলেন। তখন বরিশাল এর সব কলেজ ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের
অধীন তাই তাদের বার্ষিক মৌখিক পরীক্ষা হতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। কলেজ
থেকে আসা একজন ছাত্রীর গণিতের মেধা দেখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা
চমকে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বছর আবার মৌখিক পরীক্ষায় তার কৃতিত্ব দেখে গণিত
বিভাগের সকল শিক্ষকরা সিদ্ধান্ত নিল এই মেয়েকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি
করতে হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে আর
তৃতীয় বর্ষে ভর্তি পরীক্ষা নিয়েও কাউকে ভর্তি করানো সম্ভব না। কিন্তু গণিত
বিভাগের শিক্ষকরা উপাচার্যকে মেয়েটির মেধা সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পর
উপাচার্য আইন পরিবর্তন করে মেয়েটিকে তৃতীয় বর্ষে ভর্তি করালেন। যথারীতি
সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে প্রথম শ্রেণীতে তৃতীয় হয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর
পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু এসএসসি এবং এইচএসসিতে দ্বিতীয় বিভাগ
থাকার কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে পারলেন না।
শিক্ষকতা শুরু করলেন খুলনার একটি কলেজে। আর পার্টটাইম ক্লাস নিতেন নতুন
প্রতিষ্ঠিত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেহেতু তার ২টি দ্বিতীয় বিভাগ ছিল তাই
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে শুরু করলেন সেই কমতি পূরণ করার জন্য।
পিএইচডি যখন শেষ পর্যায়ে তখন যোগ দিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক
হিসেবে। এর পর মালয়েশিয়া গেলেন আবার পিএইচডি করতে এবং সেখানে এত ভাল কাজ
করলেন যে ঐ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে শিক্ষক হিসেবে নি্যোগ দিলো। এখন তিনি
মালয়েশিয়ার আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বিজ্ঞানী হিসেবে আন্তর্জাতিক
অঙ্গনে তিনি যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নালে তার
অসংখ্য প্রকাশনা রয়েছে। একবার ভাবুনতো এটি একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশের গল্প
যেখানে একবিংশ শতাব্দীতেও সবার ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি। শুধু তাই নয় এটি
একটি মেয়ের গল্প যেখানে লক্ষ লক্ষ ছেলেরাই স্বপ্ন দেখার সাহস পায় না। এটি
এমন একটি মেয়ের গল্প যে কী না জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দুইটি পরীক্ষায়
দ্বিতীয় বিভাগ পেয়েছিল, সেই মানুষটির এমন অভাবনীয় সাফল্য কি অনুপ্রেরণার এক
অনন্যসাধারণ উদাহরণ না? আমাদের দেশের অসংখ্য ছেলে-মেয়েরা যারা অল্পতেই
নিজেদের আত্ববিশ্বাস হারিয়ে ফেলে তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো অনুপ্রেরণার গল্প
আর কি হতে পারে?
-
